পর্নো আসক্তি আধুনিক মানুষের যৌন জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। শেষ পর্যন্ত সঙ্গীর সাথে মিলনের চাইতে পর্নোগ্রাফিকে বেশি ‘উপভোগ্য’ ভাবতে শুরু করেন। আধুনিক মানুষের অতিরিক্ত পর্নো আসক্তি আবার মানুষের বৈবাহিক ও পারিবারিক সম্পর্ককেও ক্ষতিগ্রস্থ করে।
আধুনিক মানুষের জীবনে পর্নো আসক্তির প্রভাব বুঝতে বৃটেনের নাগরিকদের ওপর একটি পরিসংখ্যান চালানো হয়। ন্যাশনাল সার্ভে অব সেক্স অ্যাটিচিউড এন্ড লাইফস্টাইল শিরোনামের এই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১০ বছর আগে বৃটেনের মানুষ যে হারে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হত, বর্তমানে তার হার ২০ শতাংশ কমে গেছে। পরিসংখ্যানে ১৬ থেকে ৭৪ বছর বয়স্ক ১৫ হাজার ব্যক্তি অংশ নেয়। পরিসংখ্যানে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই পর্নোগ্রাফি না দেখলে কোন ধরণের যৌন উত্তেজনা বোধ করেন না।
পর্নোগ্রাফিতে আসক্তির ক্ষতি ও প্রভাব সম্পর্কে নারীবাদী লেখক ও সমাজকর্মী নোয়ামী উলফ জানান, কোন সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার পরে বা অটোগ্রাফ নেওয়ার সময় অধিকাংশ বৃটিশ নারীই তাদের সঙ্গীদের তপর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন ও তারা কোথা থেকে সাহায্য পেতে পারে তা জানতে চান। এদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা, কোন ধরণের যৌন উত্তেজনাবোধ করেন না।
নোওমী বলেন, সম্প্রতি তিন সন্তানের এক জননী আমাকে জানায়, বিবাহের পরে তাদের সুখী যৌন জীবন থাকলেও তার স্বামী পর্ণোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ে। এখন সে তার দিকে ফিরেও তাকায় না। তিনি আরো জানান, এখন তার স্বামী পর্নোগ্রাফি না দেখলে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন না। নোওমীর মতে, দেশটির স্কুলগামীরাও পর্ণোগ্রাফিতে ভয়াবহভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছেন। স্কুলগামীদের অধিকাংশই পর্নোগ্রাফিতে এতটাই আসক্ত যে স্বাভাবিক যৌন জীবন বলতে কিছু একটা যে আছে তা তারা কল্পনাও করতে পারে না।
পর্নোগ্রাফি একদিকে স্বাভাবিক যৌন জীবনকে ক্ষতিগ্রস্থ করে অপরদিকে এর রয়েছে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব। এ প্রসঙ্গে নোয়ামী জানান, পর্নোগ্রাফিতে যেভাবে যৌন সম্পর্কে দৃশ্যায়ন হয়, বাস্তবে সেটা কোনভাবেই সম্ভব নয়। যে কারণে অনেকেই বাস্তবে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেয়ে পর্নোগ্রাফিতে বেশি আসক্ত হন। আর চলচ্চিত্রগুলোতে যৌন জীবনকে অনেক বেশি আগ্রাসীভাবে দেখান হয়, যা দেখে মানুষ উত্তেজিত হয়, কিন্তু বাস্তবে এই আগ্রাসীভাব থাকে না, যে কারণে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত হন না।
নোয়ামী বলেন,পর্নোগ্রাফি দেখলে মানুষের মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার সক্রিয় হয় ও ডোপামিন হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়। যা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে ও সুখানুভূতি দেয়। এই স্বল্প সময়ের যৌন উত্তেজনার দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্প মেয়াদী প্রভাব আছে। স্বল্প মেয়াদী প্রভাব হলো, পরবর্তী একই পর্নোগ্রাফি দেখলে আগের মত উত্তেজনা বোধ হয় না। প্রয়োজন হয় আরো আগ্রাসী কিছুর। আরও আগ্রাসী কিছু খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত আর কিছুই পাওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত যৌন উত্তেজনা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে।
পর্নোগ্রাফিতে আসক্তরা, তাদের সঙ্গীর প্রতি কম আকর্ষণ বোধ করেন। সঙ্গীদের স্বাভাবিক যৌন আচরণও তাদের যৌনতাকে উত্তেজিত করতে পারে না। এছাড়া, পর্নো আসক্তরা স্বাভাবিকভাবে যৌন উত্তেজিত হতে সময় নিলেও কিন্তু কম্পিউটারের মাউসের একটি ক্লিকেই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। এই কারণে বৃটেনের পুরুষরা তাদের সঙ্গিনীদের চেয়ে পর্নোগ্রাফি উপভোগ করতে বেশি পছন্দ করে।
দেশটির সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এখন বৃটেনের সর্বত্রই পর্নোগ্রাফির ছড়াছড়ি। প্রত্যেকের হাতেই ল্যাপটপ ও আইফোন রয়েছে। এছাড়া বৃটেনে পর্নোগ্রাফি বিষয়ক ভিডিও সহজলভ্য। ফলে, দিনকে দিন দেশটির নারী-পুরুষ স্বাভাবিক যৌন জীবন ত্যাগ করে পর্নো আসক্তিতে ভুগছেন। যা সমাজের স্বাভাবিক সম্পর্ককেও নষ্ট করছে।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের করা আরো একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যে সকল পুরুষ বিবাহিত বা যাদের সম্পর্ক আছে, তাদের অর্ধেকের বেশি পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। আর তাদের এই পর্নোআসক্তি তাদের কাজ ও সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বৃটেনের শতকরা ৪৭ ভাগ পুরুষ দিনে ৩০ মিনিট থেকে তিনঘন্টার বেশি সময় পর্নোগ্রাফি দেখে কাটান। যা তাদের কাজের জন্য খুবই ক্ষতিকর। আবার দেশটির পাঁচজনের একজন পুরুষ তাদের সঙ্গীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেয়ে পর্নোগ্রাফি দেখাকে অধিক উপভোগ্য মনে করেন।
অপরদিকে পর্নোশিল্পের উদ্যোক্তারাও নিজেদের ব্যবসা বজায় রাখতে দিনকে দিন আরো আগ্রাসী পর্নোগ্রাফি তৈরি করছে। যাতে ব্যবসা বজায় রাখার পাশাপাশি পর্নোশিল্প তাদের ক্রেতাদের ধরে রাখতে পারে।

No comments:
Post a Comment